সাম্প্রতিককালে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে উদ্ভূত বিশৃঙ্খলা- গাজী আব্দুল কাদের মুকুল
- আপডেট সময় : ১১:৩৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫ ২১৬ বার পড়া হয়েছে
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশত্যাগ করে দিল্লিতে পালিয়ে যান। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের আচরণ ক্রমশ অমার্জিত ও হস্তক্ষেপমূলক হয়ে উঠেছে। গণতন্ত্র ও জনগণের বিজয়কে মেনে নিতে না পেরে ভারত বর্তমানে বাংলাদেশ বিরোধী নানা অপপ্রচার ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত রয়েছে। এটি আজ আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই যে, ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত কখনোই বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন করেনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার আবরণে তারা স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলিতে নানা ধরনের হস্তক্ষেপ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ভারতের আচরণ এতটাই একপাক্ষিক ও আধিপত্যবাদী হয়ে উঠেছিল যে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের আগ্রাসন কার্যক্রম বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।
তবুও ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল ছিল ব্যতিক্রম। এই দুই নেতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সবসময় একটি স্বাধীন, মর্যাদাসম্পন্ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির পথে অটল থেকে, যেখানে জাতীয় স্বার্থ ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত। সুতরাং, বর্তমান সময়ে ভারতের বাংলাদেশবিরোধী মনোভাব ও আচরণ নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উচিত তার জাতীয় স্বার্থ, মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বকে সর্বাগ্রে গুরুত্ব দিয়ে, সঠিক কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এর যথাযথ জবাব প্রদান করা।
একথা অনস্বীকার্য যে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন জাতীয়তাবাদী নেতা, যিনি কখনোই বাংলাদেশের স্বার্থকে ভারতের কাছে জলাঞ্জলি দেননি। তিনি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে ছিলেন অপসহীন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। কোনো আন্তর্জাতিক চাপ, প্রতিবেশী দেশের প্রভাব কিংবা কূটনৈতিক চাতুরতা—কোনো কিছুই তাকে দেশের স্বাথবিরোধী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারেনি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সবসময় ভারতের বিভিন্ন আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ছিলেন স্পষ্ট অবস্থানে, সাহসিকতার সঙ্গে প্রতিবাদ করেছেন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। ভারতের পক্ষ থেকে নানা রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো নীতির সঙ্গে আপোষ করেননি। সর্বোপরি, শহীদ জিয়ার নেতৃত্বে দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার যে সাহসী ও দূরদর্শী প্রচেষ্টা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদাবোধ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসারীর আদর্শ আজও প্রাসঙ্গিক এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য এক অনুকরণীয় পথনিদেশ।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবসময় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে আধিপত্যবাদ নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও বন্ধুত্বের ভিত্তিতে গড়ে তোলার পক্ষপাতী ছিল। এই নীতি শুধু দলীয় নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা তৃণমূল পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের মাঝেও গভীরভাবে প্রোথিত ছিল।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শন ছিল একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সমান মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তার প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গঠিত আদর্শ ও নীতির মূল পথ থেকে অনেকাংশেই বিচ্যুত হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
বিগত দিনে বিএনপির রাজনীতিতে দলীয় নীতি, আদর্শ, শৃঙ্খলা ও ঐক্যের প্রতি নেতাকর্মীদের সকল স্তরে যে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং আন্তরিকতা দেখা যেত, সেই ঐতিহ্য এখন ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে বর্তমানে দলের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতৃবৃন্দের মধ্যে ঐক্য ও আদর্শচর্চার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে যা শুধু দলকেই নয়, দেশের রাজনীতিকেও এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একসময় যে দল
ভারতীয় আধিপত্যবাদ, সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, সেই বিএনপির একটি প্রভাবশালী অংশ আজ পরিচিত ভারতপন্থী বা ভারতের সুবিধাভোগী গোষ্ঠী হিসেবে।
এমনকি অনেকে এদের ‘দালাল’ হিসেবেও আখ্যায়িত করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই অংশটি এখন দলের মূলমন্ত্র থেকে সরে এসে বামঘেঁষা আদর্শ ও বিভ্রান্তিকর অবস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে—যা স্পষ্টত বিএনপির ঐতিহ্যবাহী জাতীয়তাবাদী ও ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন রাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অথচ বিএনপির মূল দর্শন ছিল দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবতাকেন্দ্রিক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাষ্ট্র গঠন এবং সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা। আজ সেই দর্শনের সঙ্গে দলটির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে যে দুরত্ব তৈরি হয়েছে, তা দেশের সচেতন, দেশপ্রেমিক ও ইসলামপ্রাণ জনগণের দৃষ্টিতে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ছে। এই প্রসঙ্গে দলীয় ভেতরের তথাকথিত ভারতপন্থী অংশের অস্তিত্ব ও গতরদাহ সত্যিই বিস্ময়কর হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই—কারণ, ইতিহাস সাক্ষী যে সুবিধাবাদীরা সব সময়ই প্রয়োজনে আদর্শ বদলে নিতে দ্বিধা করে না।
তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানো, আদর্শ নয়। সুতরাং, এই পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সময় এসেছে আত্মসমালোচনা করার, আদর্শের পথে পুনরাবর্তনের এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করার—তা দলটির জন্যই যেমন কল্যাণকর হবে, তেমনি দেশের জন্যও হবে আশার আলো।
এছাড়াও, সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে বিএনপির সন্তাব্য গোপন রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে বিভিন্ন মহলে জোরালো গুঞ্জন ও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। এসব অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা একদিকে জাতীয় রাজনীতির স্থিতিশীলতা ব্যাহত করছে, অন্যদিকে বিএনপির অবস্থানকেও আরও দুর্বল করে তুলছে। দলীয় প্রধানের দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনুপস্থিতি, দেশের অভ্যন্তরে শক্ত নেতৃত্বের অভাব, অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং বা দলাদলির অভিযোগ—এসব মিলিয়ে বিএনপি বর্তমানে একটি গভীর সাংগঠনিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ফলে দলের ভেতরে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা একদিকে দলীয় ঐক্যকে প্রথবিদ্ধ করছে, অন্যদিকে নেতৃত্বের প্রতি আস্থা ও সম্মানকেও ক্ষুণ্ন করছে। প্রতিদিনই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ইস্যু নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন, মন্তব্য এবং ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। এতে দলের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি সাধারণ জনগণের মধ্যে দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর হতাশা ও অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। ফলে বলা চলে, এসব কারণেই দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী বিএনপির প্রতি আস্থা হারাচ্ছে। যদি দলটি সময়মতো আত্মসমালোচনা করে, দলীয় কাঠামো সংস্কার এবং আদর্শিক অবস্থানে সুস্পষ্ট ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ না করে—তাহলে সামনে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
যাইহোক, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির কিছু কর্মী ও সমর্থক বর্তমানে অতীতের আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী ও অপশাসনের নীতিকে অনুকরণ করে নানা ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে হুমকি-ধমকি—এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এই ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে বেকায়দায় ফেলেছে। দলটির নেতৃত্ব থেকে এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত না থাকলেও, দায় এড়ানো সহজ নয়। কারণ দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেতৃত্বের উপরই বর্তায়। বিভিন্ন সময়ে এসব কর্মকাও প্রচ্ছন্নভাবে প্রশাসনের কাছেও বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্য দিয়েছে, বিশেষ করে যখন স্থানীয় পর্যায়ে সংঘর্ষ, দখলদারিত্ব কিংবা দলীয় কোন্দল নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। দলীয় গ্রুপিং ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে প্রায়ই সংঘর্ষ, মারামারি এবং প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটছে—যাতে নেতাকর্মীরা আহত বা নিহত হচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে অপকর্ম, দায়িত্বহীনতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ সরকার চলে যাওয়ায় নিরাপদ বা স্বস্তিকর পরিবর্তন নয়—কারণ বিকল্প শক্তির দিকে তাকিয়েও তাদের
আস্থা স্থাপনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এসব ঘটনা। ফলে বলা যায়, বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বিএনপির নয়, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্যই এক ধরনের হুঁশিয়ারি। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে দলটির উচিত নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা, নেতৃত্বে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং আদর্শিক অবস্থানে দৃঢ়ভাবে ফিরে যাওয়া—অন্যথায় রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি আরও গভীরতর হতে পারে।
এহেন পরিস্থিতিতে দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বারবার হুঁশিয়ারি এবং সাংগঠনিক অ্যাকশন নেওয়া সত্ত্বেও এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। অপরাধ যেন দিনে দিনে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তথাকথিত ‘সুবিধাবাদী’ বা ‘নয়া বিএনপি’ হিসেবে পরিচিত একটি অংশের কিছু নেতাকর্মী এসব অপকর্মের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তারাই সংগঠনের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে এবং দলীয় ছত্রছায়ায় দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি, মামলাবাণিজ্যসহ নানা অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। এইসব গুরুতর অভিযোগ কেন্দ্রীয় দপ্তরে একের পর এক জমা পড়ছে, যা দলীয় ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এসব নেতিবাচক ঘটনার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। তবে একইসঙ্গে কিছু এলাকায় অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী বিএনপির নাম ভাঙিয়ে এসব অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়ে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এসব ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, বিএনপির অভ্যন্তরে কিছু সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি দলীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য, অপকর্ম এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে লিপ্ত হয়েছে—যা দলটির ঐতিহ্য, নীতি এবং ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। এখনই এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে, দলের ওপর থেকে সাধারণ জনগণের আস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে ।
সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় বিশৃঙ্খলা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, সংগঠনকে সুশৃঙ্খল রাখতে হলে দলীয় নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে, এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। তারেক রহমান বলেন, "কোনো নেতাকর্মী যত বড় ত্যাগীই হোন না কেন, তার বিরুদ্ধে যত মামলা থাকুক কিংবা তিনি যত জেল-জুলুমের শিকারই হন না কেন, যদি তিনি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন—তাহলে তাকে আইনের হাতে তুলে দিতেই হবে।" তার এই কঠোর বার্তার পরিপ্রেক্ষিতে, গত দশ মাসে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে বিএনপি ৩,২০০-এরও বেশি নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেছে। এছাড়া আরও হাজারের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে এবং দলটি খুব শিগগিরই তাদের ব্যাপারেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে বিএনপি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সংগঠনের ভিতকে আরও দৃঢ় করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে বলে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন।
অন্যদিকে, ড. ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের পূর্ববর্তী আচরণ এবং বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানান আলোচনা চলছে। এই সরকার সম্পর্কে তারা এতদিন যেভাবে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন, অনেক সময় সেই ভাষা শিষ্টাচার ও সৌজন্যের সীমাও অতিক্রম করেছে—যা শেষপর্যন্ত দলটির জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনেনি। অনেকে মনে করেন, যদি বিএনপির নেতারা তখন শান্ত, যুক্তিসংগত ও গঠনমূলক ভঙ্গিতে নিজেদের বক্তব্য সরকারের কাছে তুলে ধরতেন, তাহলে তা হয়তো অধিকতর কার্যকর হতো। সেই অবস্থান সাধারণ মানুষের কাছেও আরও গ্রহণযোগ্য ও হৃদয়গ্রাহী হিসেবে প্রতিভাত হতো। সম্ভবত এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক পর্যায়ে বলেছিলেন, "এই সরকারের বিরোধিতা করে আমাদের কী লাভ?”—এই মন্তব্যের পর থেকে দলের অভ্যন্তরে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিএনপি এখন কিছুটা সংযত ভাষা ও আচরণে ফিরে এসেছে, যা রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন আশাবাদের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমরা আশা করি, যেহেতু আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’-এর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে, তাই দলটি আগাম ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে এখনই সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় মনোযোগী
হবে। বিশেষ করে, তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে যেসব বিশৃঙ্খলা ও অপকর্মের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো কঠোর হস্তে দমন করে সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করবে—এটাই দেশের সচেতন জনগণ ও দলের সমর্থকদের প্রত্যাশা।
সবশেষে, উল্লেখ করতে হয় যে, ভারতীয় মদদপুষ্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের নিষ্ঠুর, দমনমূলক ও একদলীয় শাসনের অবসান গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ঘটেছে—এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এই গণঅভ্যুত্থান ছিল ছাত্র- জনতার আত্মদানের এক অবিস্মরণীয় প্রতিচ্ছবি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল, সম্মানজনক এবং মহামান্বিত মুহূর্ত হিসেবে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঐতিহাসিক বিজয়ের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন সূর্যোদয় ঘটেছে, যেখানে শৃঙ্খলা, ন্যায়, গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকারই হবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সেই আলোকে, আমাদের প্রত্যাশা থাকবে—দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক শক্তিগুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক ও ইসলামিক মূল্যবোধসম্পন্ন রাজনৈতিক দলসমূহ, নিষিদ্ধ ও ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ এবং তাদের কিছু অবাঞ্ছিত ধূসর সংগঠন ব্যতিরেকে—একত্রিতভাবে এই নতুন বাংলাদেশের রূপায়নে আত্মনিবেদিতভাবে কাজ করবে। এই যাত্রা হোক জাতির জন্য কল্যাণময়, ঐক্যবদ্ধ এবং আলোকিত ৷ আমরা কামনা করি—ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরও সুন্দর, আরও কুসুমিত, আরও সুশোভিত—একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক ও উন্নয়নশীল জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী
















