নরসিংদীর এসপি হতে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ, প্রমাণের পরও ‘তিরস্কার’ দণ্ডে পার পেলেন পুলিশ সুপার হান্নান!
- আপডেট সময় : ০৬:০৮:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১১ বার পড়া হয়েছে
নরসিংদীতে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদায়ন পেতে ৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছিলেন বরিশাল মহানগর পুলিশের (বিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার মো. আব্দুল হান্নান। বিভাগীয় তদন্তে গুরুতর এ অভিযোগ প্রমাণিত হলেও তাকে কেবল ‘তিরস্কার’ দণ্ড দিয়ে ছেড়ে দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে পুলিশ প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়েছে, উঠেছে নৈতিকতা ও জবাবদিহি–সংক্রান্ত বড় প্রশ্ন।
সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে নরসিংদীর এসপি হওয়ার লক্ষ্যে কথিত রবিউল মুন্সী নামের এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে ৫০ লাখ টাকা দেন আব্দুল হান্নান। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই পদায়ন আটকে যায়। পরে গত বছরের ৯ নভেম্বর তিনি নরসিংদীর এসপি হিসেবে যোগদান করেন।
এর পরই ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা মণিপুরীপাড়ায় ওই রবিউল মুন্সীর অফিসে গিয়ে নিজের অধীন ডিবি ইনচার্জ এস এম কামরুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে ৫০ লাখের ঘুষ থেকে ৫ লাখ টাকা ফেরত নেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। বাকি ৪৫ লাখ টাকা ফেরতের জন্য তাদের উপস্থিতিতে একটি স্বহস্তে লিখিত দলিলও নেওয়া হয়।
এ ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর আব্দুল হান্নানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) কোনো ফৌজদারি মামলা হয়নি; বরং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা–১ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে তাকে শুধু ‘তিরস্কার’ দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।
গত রবিবার সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনির সই করা ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, তদন্ত কর্মকর্তা ও শুনানি কমিটির মতামতের ভিত্তিতে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় পুলিশ সুপার আব্দুল হান্নানকে তিরস্কার করা হলো।
তবে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে কানাঘুষা—মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নিকটাত্মীয়ের মধ্যস্থতায় বড় অংকের লেনদেনের বিনিময়েই এ লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এতে ঘুষদাতা এসপি যেমন রেহাই পেলেন, তেমনি ঘুষগ্রহীতা ব্যক্তির বিরুদ্ধেও কোনো আইনি পদক্ষেপের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও এমন দণ্ড আসলে ‘তিরস্কার নয়, পুরস্কার’। তার ভাষায়,
‘৫০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে পদায়ন নেওয়া স্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। এত অংকের টাকা কোনোভাবেই একজন কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। মানে, এ টাকা দুর্নীতির। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা পুলিশ প্রশাসনের উচিত ছিল দুদকে মামলা করা। ঘুষদাতা ও গ্রহীতা দুজনকেই আইনের আওতায় আনতে হবে।’
প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ আছে, বদলি ও ব্যক্তিগত কাজে অধস্তন পুলিশ সদস্য ব্যবহার নিয়ে সাংবাদিক নেছারুল হক খোকনের সঙ্গে মোবাইল ফোন আলাপে আব্দুল হান্নান নিজেই স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দেন। পরবর্তীতে সেই অডিও গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে পুলিশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি লিখিত জবাব দেন এবং ব্যক্তিগত শুনানিরও আবেদন করেন। গত ১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে উভয় পক্ষের বক্তব্য, নথিপত্র ও অনুসন্ধান প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়—এর পরই তিরস্কার দণ্ডের সিদ্ধান্ত আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের বহু বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। এখন তাদের আবার বিভিন্ন জেলায় সংযুক্তি, পদোন্নতি এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়নের উদ্যোগ চলছে। এসব পদায়নকে কেন্দ্র করে বড় অংকের আর্থিক লেনদেন হয়েছে—এমন অভিযোগও ভেসে বেড়াচ্ছে প্রশাসনের ভেতরে–বাইরে।
মানবাধিকারকর্মী ও সুশাসনকামী মহল বলছে, ৫০ লাখ টাকার ঘুষ প্রমাণিত কর্মকর্তাকে শুধুই ‘তিরস্কার’ করে ছেড়ে দেওয়া দেশে বিদ্যমান জবাবদিহি ও আইনের শাসনের বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে। তারা ঘুষদাতা কর্মকর্তা ও ঘুষগ্রহীতা—দুই পক্ষকেই ফৌজদারি আইনে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
















