ঢাকা ০৬:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২৬, ১০ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম ::
সিলেট বিভাগীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত সিলেট রক্তের অনুসন্ধানে আমরা সংগঠনের উদ্যোগে বিনামূল্যে ব্লাড ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত সিলেটে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা উদ্বোধন বাস–পিকআপ সংঘর্ষ ও মোটরসাইকেল ধাক্কায় ঝরলো চার প্রাণ আকরাম হেইচসি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শীতার্ত মানুষের মাঝে কম্বল বিতরণ “সাংবাদিক পরিচয়েই মরতে চাই” — তথ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে বিস্ফোরক মত মতিউর রহমান চৌধুরীর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ বরিশালে গ্রেপ্তারের আগে দুই সন্দেহভাজন আওয়ামী লীগ কর্মীকে মারধর সিলেট মহানগর বিএনপির শোক ও কর্মসূচী সাংবাদিক আনিস রহমানের মাতৃবিয়োগে সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের শোক

ফিরে দেখা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান ২০২৪- গাজী আব্দুল কাদের মুকুল

গাজী আব্দুল কাদির মুকুল
  • আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫ ১৪৫ বার পড়া হয়েছে

একটি দেশে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব কেন ঘটে? সহজ উত্তর—যখন বিরোধী মতকে দমন করা হয়, যখন রাষ্ট্রব্যাপী দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে, সামাজিক বৈষম্য দিন দিন প্রকট হয়ে ওঠে এবং বেকারত্ব জনজীবনে গভীর হতাশা নেমে আনে—তখনই জনগণের ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের রূপে। একটি দেশের জাতীয় স্বাধীনতা, ভূখণ্ড রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—এই তিনটি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। বাঙালি জাতি তার নিজস্ব ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের যে অধিকার ও ক্ষমতা অর্জন করেছে, সেটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এই স্বাধীনতাই আমাদের চূড়ান্ত অহংকার ও আত্মপরিচয়। ১৩৪২ বঙ্গাব্দ (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনমতো বারবার এই স্বাধীনতাকে রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য বাঙালি জাতির অকুতোভয় সন্তানরা আত্মত্যাগ করেছেন—এবং এখনও করে চলেছেন। বাংলার স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য বাঙালি জাতি কতবার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, কতবার মুক্তিযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেছে—তা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশ্ব ইতিহাসেও এমন আত্মদানের দৃষ্টান্ত বিরল ।

লাখো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জিত হলেও, এই দেশের মানুষকে বারবার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় শেখ মুজিব দেশের মানুষের সব গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে চাপিয়ে দেন একদলীয় শাসনব্যবস্থা, যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের সঙ্গে এক ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করে, সেই আওয়ামী লীগই পরবর্তীকালে বারবার দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। সর্বশেষ, গত দেড় দশকে শেখ হাসিনা সরকার প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন নিয়ে দেশজুড়ে চালিয়েছে দমন-পীড়নের নিষ্ঠুর তাণ্ডব—গুম, খুন, চুরি, দুর্নীতি,কারাবন্দি ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে তারা গড়ে তোলে এক আতঙ্কের পরিবেশ। এই সময়ে দেশের মানুষ যেন নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছে বিলুপ্ত ফ্যাসিবাদের ভূতকে নতুন রূপে ফিরে আসতে । এক নির্মম ও অমানবিক শাসনব্যবস্থার কবলে পড়ে আমাদের স্বদেশ হারাতে বসেছিল তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার। এ শাসনকাল যেন গণতন্ত্রের কবর রচনা করে দেশকে ঠেলে দেয় মধ্যযুগীয় অন্ধকারে—এক প্রকার আধুনিক ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র প্রতিচ্ছবি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের সূচনা ঘটে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, যেখানে তার স্বৈরশাসক চরিত্র ও ঘনিষ্ঠ মহলের প্রত্যক্ষ মদদে নৃশংসভাবে প্রাণ হারান বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক দেশপ্রেমিক ও চৌকস সামরিক কর্মকর্তা। এই বিভীষিকাময় ঘটনার পর থেকে তিনি একে একে হিংস্র মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভকে ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং দেশের সার্বিক শাসনব্যবস্থাকে এক কঠোর ও দমনমূলক রূপে পরিণত করেছেন। বলাবাহুল্য, বিরোধী মত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সেই সময় নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনকে ভিত্তি করে দেশজুড়ে অসন্তোষ চরমে ওঠে। ঠিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই, সাধারণ জনগণ, বিশেষত ছাত্র ও যুবসমাজ, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’-এর দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। সরকারি দমন-পীড়নের জবাবে উদ্ভূত হয় একটি গণঅভ্যুত্থান । আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং বিশ হাজারের বেশি আহত হন, যার মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন । আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয় যে, এই সহিংস দমন অভিযানে র‍্যাব, পুলিশ এবং সরকারের অনুগত কিছু সশস্ত্র বাহিনী সদস্য জড়িত ছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুসহ বহু সাধারণ পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা এই সহিংসতার শিকার হন । অন্যদিকে বিবিসি একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ যাচাই করে জানায়, ওই সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের’ নির্দেশ দেন। তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়—"যেখানেই পাবে, গুলি করবে।" এই নির্দেশনাই পরে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতেও বিক্ষোভকারীরা পিছু হটেনি। বরং ক্রমেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। অবশেষে, ব্যাপক জনচাপের মুখে এবং প্রশাসনিক ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে তৎকালীন সরকার বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। জাতি আবারও একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে—স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশায়। পৃথিবীর ইতিহাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল প্রাণের আত্মত্যাগ বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসেও কোনো শাসকের আমলে এমন ভয়াবহ গণহত্যার নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও, এই নির্মম দমন-পীড়ন বিক্ষুব্ধ জনগণকে আন্দোলন থেকে বিরত করতে পারেনি। তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে গণতন্ত্র, ন্যায় ও স্বাধীনতার দাবিতে। একটি প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আন্দোলনের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন—“গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না স্যার,এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।” এই সংলাপটি যেমন একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি একটি নিপীড়িত জাতির অন্তর্নিহিত সাহসিকতার প্রমাণও বটে। এছাড়াও এই গণঅভ্যুত্থানে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে আত্মত্যাগ, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল, তা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এর কিছু দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, বরং জাতির অনুভূতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যেমন—একজন ৯-১০ বছরের নাদুস-নুদুস শিশু রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলছে, "আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, আমি মরতে এসেছি", সাংবাদিকের প্রশ্নে সে জানাচ্ছে, "আমার ভাইদের ওরা মেরে ফেলেছে, আমার বেঁচে থেকে কি লাভ?" বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক তরুণী বলছেন, "এই দেশে বেঁচে থেকে কি লাভ, তাই মরতে এসেছি।" এমনকি একটি ৫-৬ বছরের শিশু, তার সীমাহীন রাগ ও ঘৃণা নিয়ে পুলিশের পেটে ঘুষি মারছে, অভিভাবক তাকে থামাতে পারছেন না—যদি সে নাগাল পেত, হয়তো ছোট্ট হাতে পুলিশের মুখেও ঘুষি বসিয়ে দিত। আবার দেখা যায় ৬-৭ বছরের শিশুরা পানির বোতল হাতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মাঝে ছুটে গিয়ে বলছে, "ভাইয়া, পানি লাগবে? আপু, পানি লাগবে ? মুগ্ধ ভাইয়া পানি পাঠিয়েছে।" এই দৃশ্যগুলো শুধু আন্দোলনের ব্যাপ্তি নয়, বরং একটি জাতির সমবেত আবেগ, কষ্ট, এবং প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে—যা দেখে কেউই সহজে চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না ।

পরিশেষে, বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও নির্ভীকতা নিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে নানাভাবে অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এ দেশের ছাত্র-জনতার ত্যাগ, তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়েই এই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে—নিঃসন্দেহে বলা চলে, "বীরের এই রক্তস্রোত, মাতার এই অশ্রুধারা যায়নি বৃথা, যাবেনা বৃথা।" ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনাকে সরাতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনপণ সংগ্রাম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক হিরন্ময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এখন আমাদের সামনে নতুন দায়িত্ব—দেশ গঠন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও গর্বিত জাতি হিসেবে পুনরুত্থানের চ্যালেঞ্জ। এই মহান লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই বিজয়ী হতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

ফিরে দেখা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান ২০২৪- গাজী আব্দুল কাদের মুকুল

আপডেট সময় : ০৯:৫৬:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৪ অগাস্ট ২০২৫

একটি দেশে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লব কেন ঘটে? সহজ উত্তর—যখন বিরোধী মতকে দমন করা হয়, যখন রাষ্ট্রব্যাপী দুর্নীতি চরম আকার ধারণ করে, সামাজিক বৈষম্য দিন দিন প্রকট হয়ে ওঠে এবং বেকারত্ব জনজীবনে গভীর হতাশা নেমে আনে—তখনই জনগণের ভিতরে জমে থাকা ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়ে ওঠে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবের রূপে। একটি দেশের জাতীয় স্বাধীনতা, ভূখণ্ড রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব—এই তিনটি একে অপরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। বাঙালি জাতি তার নিজস্ব ভূখণ্ড, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের যে অধিকার ও ক্ষমতা অর্জন করেছে, সেটিই বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি। এই স্বাধীনতাই আমাদের চূড়ান্ত অহংকার ও আত্মপরিচয়। ১৩৪২ বঙ্গাব্দ (১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত, প্রয়োজনমতো বারবার এই স্বাধীনতাকে রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য বাঙালি জাতির অকুতোভয় সন্তানরা আত্মত্যাগ করেছেন—এবং এখনও করে চলেছেন। বাংলার স্বাধীনতাকে রক্ষার জন্য বাঙালি জাতি কতবার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, কতবার মুক্তিযুদ্ধে আত্মনিয়োগ করেছে—তা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশ্ব ইতিহাসেও এমন আত্মদানের দৃষ্টান্ত বিরল ।

লাখো মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ভূখণ্ড অর্জিত হলেও, এই দেশের মানুষকে বারবার তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে। স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় শেখ মুজিব দেশের মানুষের সব গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে চাপিয়ে দেন একদলীয় শাসনব্যবস্থা, যা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের রক্তের সঙ্গে এক ভয়াবহ বিশ্বাসঘাতকতা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, যে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করে, সেই আওয়ামী লীগই পরবর্তীকালে বারবার দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। সর্বশেষ, গত দেড় দশকে শেখ হাসিনা সরকার প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন নিয়ে দেশজুড়ে চালিয়েছে দমন-পীড়নের নিষ্ঠুর তাণ্ডব—গুম, খুন, চুরি, দুর্নীতি,কারাবন্দি ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতনের মাধ্যমে তারা গড়ে তোলে এক আতঙ্কের পরিবেশ। এই সময়ে দেশের মানুষ যেন নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করেছে বিলুপ্ত ফ্যাসিবাদের ভূতকে নতুন রূপে ফিরে আসতে । এক নির্মম ও অমানবিক শাসনব্যবস্থার কবলে পড়ে আমাদের স্বদেশ হারাতে বসেছিল তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের মৌলিক অধিকার। এ শাসনকাল যেন গণতন্ত্রের কবর রচনা করে দেশকে ঠেলে দেয় মধ্যযুগীয় অন্ধকারে—এক প্রকার আধুনিক ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’র প্রতিচ্ছবি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের সূচনা ঘটে ২০০৯ সালের বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, যেখানে তার স্বৈরশাসক চরিত্র ও ঘনিষ্ঠ মহলের প্রত্যক্ষ মদদে নৃশংসভাবে প্রাণ হারান বাংলাদেশের অর্ধশতাধিক দেশপ্রেমিক ও চৌকস সামরিক কর্মকর্তা। এই বিভীষিকাময় ঘটনার পর থেকে তিনি একে একে হিংস্র মনোভাব নিয়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তম্ভকে ধ্বংস করে দিয়েছেন এবং দেশের সার্বিক শাসনব্যবস্থাকে এক কঠোর ও দমনমূলক রূপে পরিণত করেছেন। বলাবাহুল্য, বিরোধী মত দমন, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সেই সময় নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনকে ভিত্তি করে দেশজুড়ে অসন্তোষ চরমে ওঠে। ঠিক একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মতোই, সাধারণ জনগণ, বিশেষত ছাত্র ও যুবসমাজ, ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’-এর দাবিতে রাজপথে নেমে আসে। সরকারি দমন-পীড়নের জবাবে উদ্ভূত হয় একটি গণঅভ্যুত্থান । আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার মতে, এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং বিশ হাজারের বেশি আহত হন, যার মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গু বা দৃষ্টিহীন হয়ে পড়েন । আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয় যে, এই সহিংস দমন অভিযানে র‍্যাব, পুলিশ এবং সরকারের অনুগত কিছু সশস্ত্র বাহিনী সদস্য জড়িত ছিলেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুসহ বহু সাধারণ পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা এই সহিংসতার শিকার হন । অন্যদিকে বিবিসি একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপ যাচাই করে জানায়, ওই সময়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে ‘মারাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের’ নির্দেশ দেন। তাঁর কণ্ঠে শোনা যায়—"যেখানেই পাবে, গুলি করবে।" এই নির্দেশনাই পরে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নেয়। এই পরিস্থিতিতেও বিক্ষোভকারীরা পিছু হটেনি। বরং ক্রমেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। অবশেষে, ব্যাপক জনচাপের মুখে এবং প্রশাসনিক ভেঙে পড়ার প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্ট ২০২৪ সালে তৎকালীন সরকার বিশেষ করে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা ত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। জাতি আবারও একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে—স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশায়। পৃথিবীর ইতিহাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এত স্বল্প সময়ে এত বিপুল প্রাণের আত্মত্যাগ বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাসেও কোনো শাসকের আমলে এমন ভয়াবহ গণহত্যার নজির খুঁজে পাওয়া যায় না। তবুও, এই নির্মম দমন-পীড়ন বিক্ষুব্ধ জনগণকে আন্দোলন থেকে বিরত করতে পারেনি। তারা বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে গণতন্ত্র, ন্যায় ও স্বাধীনতার দাবিতে। একটি প্রচারিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আন্দোলনের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তা তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন—“গুলি করি, মরে একটা, বাকিডি যায় না স্যার,এইটা হলো স্যার সবচেয়ে বড় আতঙ্কের এবং দুশ্চিন্তার বিষয়।” এই সংলাপটি যেমন একটি নিষ্ঠুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, তেমনি একটি নিপীড়িত জাতির অন্তর্নিহিত সাহসিকতার প্রমাণও বটে। এছাড়াও এই গণঅভ্যুত্থানে দেশের সর্বস্তরের মানুষের যে আত্মত্যাগ, স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল, তা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এর কিছু দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, বরং জাতির অনুভূতিকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। যেমন—একজন ৯-১০ বছরের নাদুস-নুদুস শিশু রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলছে, "আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না, আমি মরতে এসেছি", সাংবাদিকের প্রশ্নে সে জানাচ্ছে, "আমার ভাইদের ওরা মেরে ফেলেছে, আমার বেঁচে থেকে কি লাভ?" বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া এক তরুণী বলছেন, "এই দেশে বেঁচে থেকে কি লাভ, তাই মরতে এসেছি।" এমনকি একটি ৫-৬ বছরের শিশু, তার সীমাহীন রাগ ও ঘৃণা নিয়ে পুলিশের পেটে ঘুষি মারছে, অভিভাবক তাকে থামাতে পারছেন না—যদি সে নাগাল পেত, হয়তো ছোট্ট হাতে পুলিশের মুখেও ঘুষি বসিয়ে দিত। আবার দেখা যায় ৬-৭ বছরের শিশুরা পানির বোতল হাতে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার মাঝে ছুটে গিয়ে বলছে, "ভাইয়া, পানি লাগবে? আপু, পানি লাগবে ? মুগ্ধ ভাইয়া পানি পাঠিয়েছে।" এই দৃশ্যগুলো শুধু আন্দোলনের ব্যাপ্তি নয়, বরং একটি জাতির সমবেত আবেগ, কষ্ট, এবং প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে—যা দেখে কেউই সহজে চোখের জল ধরে রাখতে পারবে না ।

পরিশেষে, বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যারা সাহসিকতা, আত্মত্যাগ ও নির্ভীকতা নিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে নানাভাবে অবদান রেখেছেন, তাদের প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। এ দেশের ছাত্র-জনতার ত্যাগ, তিতিক্ষা ও রক্তের বিনিময়েই এই বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে—নিঃসন্দেহে বলা চলে, "বীরের এই রক্তস্রোত, মাতার এই অশ্রুধারা যায়নি বৃথা, যাবেনা বৃথা।" ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনাকে সরাতে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জীবনপণ সংগ্রাম ইতিহাসে চিরস্মরণীয় এক হিরন্ময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। এখন আমাদের সামনে নতুন দায়িত্ব—দেশ গঠন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও গর্বিত জাতি হিসেবে পুনরুত্থানের চ্যালেঞ্জ। এই মহান লক্ষ্যে আমাদের অবশ্যই বিজয়ী হতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী