No icon

……অনুসন্ধানী প্রতিবেদন-১

উখিয়ার কালু সওদাগর ‘ইয়াবা জগতের এক অন্তহীন কালো কাহিনীর জনক’ !

শাহজাহান চৌধুরী শাহীন,কক্সবাজারঃ

কক্সবাজারের ইয়াবা ব্যবসার যে ক’জন পৃষ্ঠপোষক বা গডফাদার রয়েছেন তারা সবাই প্রভাবশালী। অধিকাংশ গডফাদার সব সময় থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইয়াবা গডফাদাররা সরাসরি ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত না থাকায় তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। কালো টাকার প্রভাব খাটিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গডফাদাররা ইয়াবা ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানেও ইয়াবার গাডফাদাররা ধরা পড়েছেন না। ইয়াবা জগতের এক অন্তহীন কালো কাহিনীর জনক উখিয়া উপজেলার রত্লাপালং ইউনিয়নের রুহুল্ল্যার ডেবা ( কোটবাজার) গ্রামের কালু সওদাগর।

যিনি গরু ব্যবসার আড়ালে দীর্ঘদিন ইয়াবা ব্যবসা চালিয়ে আসছে। গত ৬ থেকে ৭ বছরে এই কালু সওদাগর কত কোটি টাকার মালিক, সেটা নিজেও জানেন না। গরু ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা ব্ল্যাকার কালু সওদাগর, গত ৮ বছর আগেই রত্লাপালংয়ে প্রথম ইয়াবা পাচারের জনক বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছেন। যার কালো কাহিনী হয়ত বলে শেষ করা যাবে না। যতই খোঁজ করছি, তার কালো অধ্যায়ের হিসেবের খতিয়ানটি যেন ততই বড় হচ্ছে। গত কয়েকদিন আগেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এই কালুর বাড়িতে অভিযান চালিয়েছিল।

উখিয়ার রত্লাপালংইউনিয়নের একটি অজপাড়া গ্রাম রুহুল্ল্যার ডেবা। আশপাশের বেশির ভাগ বাড়ি কাচা। সেই গ্রামীণ জনপদের ঝাউতলা রোডে কালো সওদাগরের (পাঁচতলা ফাউন্ডেশন) সাদা রঙ্গের ভিআইপি ডুপ্লেক্স বাড়িটি সবার নজর কাড়ে। গরুর বাজারে এই কালো সওদাগরকে ইয়াবা কালো হিসেবে চিনেন।

মিয়ারমারের বড়ো মাপের ইয়াবা কারবারী সিরাজুল হক প্রকাশ সিকুইন্নাই (উখিয়া পালংখালীর ওপারে মিয়ানমার কুয়াংছি বং তার বাড়ি) এর সাথে ৮/১০ বছর ধরে পরিচয় কালুর। এই সিক্কুইন্না এক সময় কক্সবাজারের পালংখালী ও কক্সবাজার শহরে থাকতেন। তার একাধিক বাড়িও রয়েছে শহরে ও চট্টগ্রামে। বর্তমানে সিকুইন্না মিয়ানমারে অবস্থান করে ইয়াবার বড় বড় চালান পাঠাচ্ছে কালুৃ সহ বিভিন্ন জনের নামে। তারও রয়েছে পুরো কক্সবাজার জেলা ব্যাপী নেটওয়ার্ক।

সুত্রে আরো জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে গরু আমদানীর সুত্র ধরে পরিচয় হয় টেকনাফের কুখ্যাত হুন্ডি ব্যবসায়ী ও ইয়াবা কারবারী জাফর প্রকাশ টিটি জাফরের সাথে। এই টিটি জাফরই কালু সওদাগরের মুল পার্টনার ছিল এবং হুন্ডির মাধ্যমেই মিয়ানমারে টাকা পাঠাতেন। গত ৬/৭ বছরে গরুর ব্যবসার আড়ালে ইয়াবার কারবার করে কোটি টাকার জমি কিনেছেন, কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ, ২টি নিজস্ব ট্রাক, রুহুইল্ল্যার ডেবায় অর্ধশত গরু নিয়ে বিশাল গরুর ফার্মও করেছে। গরু ব্যবসার সুত্র ধরে ওপার মিয়ানমারের বড়ো বড়ো ইয়াবা কারবারীর সাথে রয়েছে কালু সওদাগরের যোগাযোগ।
তাদের কাছে বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী হিসেবে আস্থা অর্জন করায় সেই কালু সওদাগরের নামেও লাখ লাখ পিস ইয়াবা বাকীতে পাঠানো হয় বলেও অভিযোগ। ভালুকিয়ার মধ্যচরপাড়ার নুরুল আলমও তার সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য এবং তার পার্টনার বলে জানা গেছে।

এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, হিজলিয়া গ্রামের মীর জাফর তার ইয়াবার চালান নিয়ে একাধিক বার ধরাও পড়েছে উখিয়া, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে। গত ৪ বছর আগে কালু সওদাগরের ইয়াবার চালান নিয়ে উখিয়ায় আটক হয়েছিল মৃত শফিকুর রহমানের ছেলে এই মীর জাফর। এঘটনায় মামলা হলে কালু সওদাগরকেও পলাতক আসামী করা হয়েছিল। পরে কালো সওদাাগর কালো টাকায় চার্জসীট থেকে নাম বাদ দেয়ার ব্যবস্থা করেন। চার্জসীট থেকে এই যাত্রায় বাদও পড়ে তিনি। সেই সময় উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি হাবীবুর রহমান এই কালুকে ধরেও এনেছিল থানায়। বর্তমানেও এই মীর জাফর ইয়াবা মামলায় কারাগারে আছেন।

   ছোট ভাইয়ের মেহেদী সন্ধ্যায় কালু সওদাগর

 

খোঁজ নিতে গিয়ে যা দেখলাম, তাতে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়েছে, তা হচ্ছে মিয়ানমার থেকে গরু ব্যবসা করে যত টুকু পরিচিতি লাভ করেছে তার চেয়ে বেশি ইয়াবা ব্ল্যাকিং করে কালো টাকা আয় করেছে কালু সওদাগর। কিন্তু গরুর ব্যবসার আড়ালে অত্যন্ত সুক্ষভাবে এবং সবদিক ঠিক রেখে ইয়াবার কারবার চালানোর কারণে তাই চাপা পরেছিল এতদিন। উখিয়ায় গত কয়েকদিন ব্যাপক অনুসন্ধান করে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তাতে বিস্মীত হওয়ারই কথা। রুহুরল্ল্যার ডেবা এলাকার ভাল-খারাপ সমস্ত কিছুই পরিচালিত হয় কালোবাজারি কালুর কথায়।

তাই প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তিটাও লাগতো শতভাগ। উখিয়া, কোটবাজার ও কক্সবাজার শহরের বেশ কয়েকটি ব্যাংক হিসেবে তার অস্ভাবিক লেনদেন দেখে অবাক হয়ে যান এলাকাবাসী। তার পিতা এক সময় মানুষের বাড়িতে মাটি কাটার শ্রমিক ছিলো। অর্থবিত্ত তেমন ছিল না। ইয়াবার আদলে এখন কত কোটি টাকার মালিক সেই কালু সওদাগরও জানেন না। ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিয়ে, কতিপয় জনপ্রতিনিধিদের হাতে রেখে এই মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে। পুরো দেশে ব্যাপী তার ইয়াবা নেটওয়ার্ক রয়েছে বলে সুত্রে প্রকাশ।

কথা হয় মরিচ্যা গরু বাজার এলাকার এনাম নামের এক ব্যবসায়ীর সাথে। তিনি বলেন, গরুর ব্যবসা করে এভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া অসম্ভব। নিশ্চয় তিনি অন্য কোন ব্যবসায় জড়িত। আমার মতো অনেকে গরু ব্যবসা করে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করছি, সেখানে কালু সওদাগর কোটি কোটি টাকা কিভাবে আয় করবেন?

দায়িত্বশীল সুত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম নতুন ব্রীজ এলাকায় গরু ভর্তি গাড়ীতে করে ইয়াবা পাচারের সময় গাড়ি আটক হয়েছিল। কিন্তু কালো টাকার জোরে সেই ঘটনা বেশি দুর এগুয়নি।

একই ভাবে চকরিয়া বানিয়ারছড়া হাইওয়ে পুলিশের হাতেও আটক হয়েছিল গরু ভর্তি ট্রাক। টাকার জোরে বার বার পার পেয়ে যায় এই কালু সওদাগর। শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়া কালু কোট বাজার, কক্সবাজার ও উখিয়ার বিভিন্ন ব্যাংকে দৈনিক কোটি কোটি লেনদেন করেন। গরুর ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা পাচার করে এখন কোটি কোটি টাকার মালিক কালু।

রত্লাপালং রুহুল্যার ডেবার ইয়াবা ডন কালু সওদাগরের উত্তানের নেপথ্যে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রোঙ্গিাদের সাথে আতাঁত করে মো. কালু নামের রহস্যময় এই ব্যক্তি গত কয়েক বছরের ব্যবধানে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া নিয়ে স্থানীয় মানুষ বিস্মিত হয়েছেন। এই কালু আর্ন্তজাতিক ইয়াবা ডন খ্যাত সিরাজুল ইসলাম প্রকাশ সিকুইন্নার হাত ধরেই মিয়ানমার থেকে গরুর ব্যবসার আড়ালে চালিয়ে আসছিল ভয়ংকর ইয়াবা। ইয়াবা ডন কালু এখন সওদাগরের তকমা লাগিয়েছে।

বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গরু ভর্তি ট্রাক থেকে ইয়াবা আটক করলেও কালো টাকার জোরে পার পেয়েছে বেশ কয়েক বার। গত কয়েকদিন আগে ইয়াবা চালান ও নগদ টাকা মজুদের খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তার বাড়িতে অভিযানও চালিয়েছিল। তবে সুচতুর কালু সওদাগর ওই বাহিনী যাওয়ার আগেই নগদ টাকা ও ইয়াবা সরিয়ে ফেলেন বলে সুত্রে প্রকাশ। এরকম ইয়াবা কারবারের চিত্রের অনুসন্ধানে যতটুকু উঠে এসেছে তা ১০ভাগের এক ভাগও নয়।

এব্যাপারে কালু সওদাগরের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি প্রথমে তার পরিচয় গোপন করেন এবং কি বলার আছে বলতে বলেন। কথার এক পর্যায়ে তিনি ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে বড় মাপের গরু ব্যবসায়ী দাবী করে মোবাইলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

এব্যাপারে উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এর সরকারী নাম্বারে একাধিক বার রিং করেও রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

Comment As:

Comment (0)